জমি নিয়ে বিরোধের জেরে করা মিথ্যা মামলায় কারাভোগ করতে হয়েছে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার এক বাবা ও তার ছেলেকে। তাদের বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ঔষধি গাছ কেটে ফেলা ও পুকুর থেকে মাছ লুটের অভিযোগ এনেছিলেন একই গ্রামের ভজন সরকার। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, এতগুলো গাছ কাটার ও চাঁদা দাবির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদেরও দাবি, মামলায় বর্ণিত ঘটনার সত্যতা নেই। অন্যদিকে মামলার বাদী ভজন সরকার জমি জবরদখলের পাল্টা অভিযোগ করেছেন।
ঘটনাটি উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নের দক্ষিণ সোহাগপুর গ্রামের। মামলার বাদী ভজন সরকার ওই ইউনিয়নের একজন গ্রাম পুলিশ সদস্য। অন্যদিকে অভিযুক্ত সন্তোষ সরকার ও তার চার ছেলে একই গ্রামের বাসিন্দা। দুই পক্ষের বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে জমির মালিকানা ও দখল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে একই গ্রামের সুশীল সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে সাফকবলা দলিলের মাধ্যমে কয়েক দফায় জমি কেনেন সন্তোষ সরকার। দীর্ঘদিন ধরে সেই জমি ভোগদখল করে আসছিলেন তিনি। তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে সুশীল সরকারের চাচাতো ভাই মেঘনাথ সরকার ও ভজন সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে ওই জমিতে মালিকানা দাবি করেন।
একপর্যায়ে গত ফেব্রুয়ারিতে সন্তোষ সরকারের কেনা ও ভোগদখলে থাকা ২৫ শতক জমি তারা দখল করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে গত ১১ আগস্ট সন্তোষ সরকার ওই জমির দখল পুনরুদ্ধার করেন। এ নিয়ে পরদিন দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা ও মারামারির ঘটনা ঘটে। এরপর উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি মামলা করে।
জমি নিয়ে বিরোধের মধ্যে গত ২৫ জুলাইয়ের একটি ঘটনার উল্লেখ করে সন্তোষ সরকার ও তার চার ছেলের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করেন ভজন সরকার। অভিযোগে বলা হয়, দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তারা বাদীর বাড়িতে প্রবেশ করে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এ সময় মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় তিন লাখ টাকা মূল্যের ঔষধি গাছ কেটে ফেলা হয়। এ ছাড়া বাড়ির সামনের পুকুর থেকে ৭০ হাজার টাকার মাছ লুটের অভিযোগও করা হয়।
আদালত অভিযোগটি তদন্তের জন্য নালিতাবাড়ী থানার পুলিশকে নির্দেশ দেন। পরে তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) চন্দন প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত অভিযুক্তদের হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন।
তবে আদালতের সমন যথাযথভাবে অভিযুক্তদের কাছে পৌঁছেছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাদী সমন গোপন করে ফেলায় তারা আদালতে হাজির হতে পারেননি। পরে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে সন্তোষ সরকার ও তার এক ছেলেকে কারাভোগ করতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত ২৫ জুলাই মামলায় উল্লেখ করা ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। মামলায় যে ঔষধি গাছ কাটার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোও ভজন সরকারের বাড়িতে ছিল না বলে দাবি তাদের।
গাছ কাটার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দেখতে চাইলে ভজন সরকার প্রতিবেদককে তা দেখাতে পারেননি। তবে তিনি সন্তোষ সরকারের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক জমি দখলের অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে একাধিক মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সন্তোষ সরকারের ভাষ্য, সাফকবলা দলিলের মাধ্যমে জমি কিনে দীর্ঘদিন ধরে তিনি ভোগদখল করে আসছেন। তার অভিযোগ, ভজন সরকার ও মেঘনাথ সরকার জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করে তার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা করেছেন। এসব মামলার কারণে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রতিকার চেয়ে তিনিও পাল্টা মামলা করেছেন বলে জানান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই চন্দন বলেন, তদন্তে এতগুলো গাছ কাটার ও চাঁদা দাবির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাদীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সমন জারি করেছিলেন। বিবাদীপক্ষ আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধের জেরে পাল্টাপাল্টি মামলার এই ঘটনায় একদিকে হয়রানির অভিযোগ, অন্যদিকে জমি জবরদখলের পাল্টা দাবি উঠেছে। তবে জমি নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ।